সাহিত্য বাগান-এর ওয়েব ম্যাগাজিনে (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস) আগষ্ট সংখ্যায় মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন'র রচিত গল্প --
(ছোট গল্প)
বাংলার রাজকুমার
গ্রীষ্মের তাপদাহ। জনজীবন বিপন্ন প্রায়। মাঠঘাট প্রখর রোদে চৌচির। বারিবিন্দুর প্রত্যাশায় চাতক-চাতকিনী উর্দ্ধ গগনে উন্মুখ, সমগ্র জীবকুল ক্লিষ্ট -তপ্ত প্রহর গণনারত। তারই মাঝে সহসা নীরবে এক রাজকুমার পৃথিবীকে আলোকিত করে আবির্ভূত হয়। যার কোনো সিপাহশালা, হাতিঘোড়া, ময়ুরপঙ্খী কিংবা সুসজ্জিত বাহিনী ছিলোনা।
পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় ক্লাসে ঢুকেই প্রধান শিক্ষক জনাব নুরুল আলম এভাবেই শুরু করেন। তিনি বলেন, আজ এই তীব্র গরমে আমি কোনো ক্লাস নিবো না, শুধু এই রাজকুমারের গল্প বলবো। তোমরা শুনবে? সকল শিশু খুশিতে চিৎকার করে বলে, জী স্যার। স্যার আবার বলতে শুরু করেন। এই রাজকুমারের জন্ম এদেশের মাটিতেই, এদেশের আলো বাতাসেই তার বেড়ে ওঠা। অন্য দশটা গ্রামের শিশুর মতোই বনে-বাদাড়ে আর পুকুর-নদীতে সাঁতার কেটে অতিবাহিত হয়েছে তার মহামূল্যবান শৈশব আর কৈশোর।
নিদারুণ ছোট্টো ছেলে হলেও চিত্ত ছিলো অনাবিল আনন্দে ভরপুর, মনমেজাজ ছিলো পরিপুষ্ট। শৈশবেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এদেশের মানুষের মনে সীমাহীন কষ্ট, পরাধীনতার জ্বালা। কৈশোরে এসে সে উপলব্ধি আরো দৃঢ়তর হয়। মৃতপ্রায় জাতির জন্য তার হৃদয়ে কষ্টপাখি অবিরাম ছটফট করতে থাকে। দেশ ও জাতির কথা তিনি বাড়ির পাশের বকুল গাছের তলায় বসে গভীরভাবে ভাবতেন। ভাবতে ভাবতেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন পার্শ্ববর্তী নদীর বুকে। দীর্ঘক্ষণ সাঁতরে মন শান্ত করে ফিরতেন বাসায়। কথায় আছে, সকালের সূর্যকে দেখলেই দিনটি কেমন হবে তা বলা যায়। তেমনি এই রাজকুমারের শৈশব দেখেই বাবা-মার মনে জানান দেয় ছেলে কিছু একটা হবে; একদিন সে সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়, দেশ ও জাতি তথা বিশ্বের মুখ উজ্জ্বল করবে।
মায়ের পরম আদর-যত্নে রাজকুমার বেড়ে উঠতে থাকে। পাশাপাশি বাবা দেশ-বিদেশের গল্প শোনান, শোনান ক্ষুদিরামের ফাঁসির ইতিহাস। মাঝেমধ্যে বলেন নিজদেশে পরবাসী জাতির দুঃখের কথা। তখন তার মন জাতির মুক্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক অঙ্গন টানতে থাকে নিবিষ্টভাবে। সাত বছর বয়সে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি রাজকুমারের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলার প্রতিও দারুণ ঝোঁক ছিলো। আবার এতোটাই হৃদয়বান ছিলেন যে বাবার রাজকুমারকে প্রতিমাসে বেশ কয়েকটি ছাতা কিনে দিতে হতো। কারণ তার গরীব বন্ধুরা যাতে রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট না পায় সেজন্য নিজেরটা তাদের দান করতেন। একদিনতো নিজের পাজামা-পাঞ্জাবি একজনকে দান করে চাদরে সারা শরীর জড়িয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
এভাবেই ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেন রাজকুমার, একসময় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তৈরি হয় প্রতিবাদের ভাষা, দৃঢ়কন্ঠ আর অর্জন করেন দেশপ্রেম, নেতৃত্বগুণ, সততা, পাহাড়সম সাহস, আকাশ ছোঁয়া বীরত্ব। তাই সবেমাত্র ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক রোষানলে তাকে সাত দিন কারাভোগ করতে হয়েছে। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী থাকাকালীন দ্বিতীয়বার কারাবরণ করেন। বাংলা বিভাগের পর ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনে প্রথম গ্রেফতার হওয়া সেই বীর রাজকুমার তাঁর জীবদ্দশায় জাতির মুক্তির লক্ষ্যে মোট ৩০৫৩ দিন জেলখানায় দিনাতিপাত করেন।
জেল-জুলুমে যে রাজকুমার দমে যাবার পাত্র নন। নেতৃত্বগুণ, সাহস ও দক্ষতার অভূতপূর্ব স্ফুরণ ঘটিয়ে বন্ধুর পথ হয়ে ওঠেন জাতির কন্ঠস্বর। অনন্য বাকপটুতার দরুন ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে একাত্মভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেষণা জোগায়। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে রূপকথার পাখির মতো জাগিয়ে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন আঁকেন। ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়গাঁথার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। তিনি আজও বাঙালির মানসপটে সমুজ্জ্বল, নতুন প্রজন্মের কাছে প্রজ্জ্বলিত দীপশিখা, বর্তমান সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অভিযাত্রায় প্রেরণার আলোকবর্তিকা।
তোমরা এতোক্ষণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো আমি কোন রাজকুমারের গল্প বলছি। হ্যাঁ, এই মহান ব্যক্তি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন শেখ লুৎফর রহমান ও সাহেরা খাতুনের আদরের খোকা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপকার ও স্থপতি, বাঙ্গালি জাতির জনক ও মহানায়ক, শিশু-কিশোরদের আদর্শ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কালের-মহাকালের এ মহানায়ক গোটা বিশ্বজাতির নিকট চির ভাস্বর, চির অম্লান হয়ে থাকবে।
মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেন
সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার
কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী।