ভুনাখিচুড়ি-(অণুগল্প)| প্রকাশ চন্দ্র রায়

 




ভুনাখিচুড়ি-(অণুগল্প
প্রকাশ চন্দ্র রায়

বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে, আর একটা মাত্র চরণ লিখতে পারলেই পূর্ণাঙ্গ একটা রোমান্টিক কবিতা হয়ে যাবে। আবেগাতিশয্যে অস্থির ম্যাডাম। শেষ চরণটার ছন্দ-অনুপ্রাস মেলাতে পারছেন না বলে অস্থির হয়ে ভাবছেন। ওদিকে আস্ত একটা ব্রয়লার মুরগীর কুচি কুচি করা মাংস আর চাল-ডাল সহযোগে শখের ভুনাখিচুড়ির রান্নাটা চাপিয়ে এসেছেন কিচেনে। জ্বলন্ত চুলায় চাপানো খিচুড়ি এখন কোন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে সে খেয়াল নেই তার। ফেবুতে বেশ-কয়েকটা কবিতা সুনামের সাথে ভাইরাল হওয়ায় বেশকিছু গ্রুপের সদস্যরা তার প্রসংশায় পঞ্চমুখ এখন। এমতাবস্থায় দিনেরাতে বেশ জোরেসোরে চালিয়ে যাচ্ছেন কবিতাচর্চা,আজ সন্ধ্যার আগেই পোস্ট করবেন সদ্যলেখা এ কবিতাটা,কিন্ত কী অবাক কাণ্ড! তিন তিনটে স্তাবক লিখেও চতুর্থ বা শেষ চরণটা লিখে ফেলে সমাপ্ত করতে পারছেন না লেখাটা! কেন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব! পছন্দসই শব্দ যোগান দিচ্ছে না মস্তিস্ক। কবিতার শব্দ খুঁজতে যখন ব্যস্ত ম্যাডাম-কবি। নামাজ পড়ে এসে সাহেব ডাকলেন,
-কী ব্যাপার কবি ম্যাডাম? সাহিত্যচর্চা শেষ হবে কখন?
ক্ষুধায় তো পেট পুড়ে যাচ্ছে একদম।
- আর একটুক্ষণ সবুর করো প্লিজ, আর মাত্র কয়টা লাইন লিখলেই শেষ হচ্ছে লেখাটা। তারপরেই খেতে দিচ্ছি তোমাকে।
-তা না হয় দিও,কিন্তু খাবারটা কী হবে আজ শুক্রবারে?
- হে হে হে,নির্লিপ্তভাবে মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে জবাব দিলো ম্যাডাম,
-আজকে চমকে দিবো তোমাকে স্যার! এই বৃষ্টিমুখর গুমোট দুপুরে যা একখান খাবার হচ্ছে না! একবার খেলে বাকী জীবনেও ভুলতে পারবে না আর!
সোহাগী-স্ত্রীর  কথা শুনে জিবে জল এসে গেল স্বামীর। কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
-কী সে খাবার ম্যডাম?
সাহেবের প্রশ্নের জবাব আর দিতে হলো না, তার আগেই    
কিচেন থেকে চিকেন পোড়ার পোড়ালি গন্ধ এসে নাকে ঢুকলো উভয়ের।
চমকে উঠলো দুজনেই! কীসের গন্ধ! কীসের গন্ধ!
গন্ধটা কীসের, সাহেব বুঝতে না পারলেও ম্যাডাম ঠিকই বুঝে ফেললেন। ঝটপট করে ছুটে গেলেন তিনি রান্নাঘরে।
-হায়! হায়! একি সর্বনাশ হলো! সব খিচুড়ি তো পুড়ে পুড়ে ছাই ছাই হয়েছে প্রায়! একি আর খাওয়া যাবে?
আধাপোড়া খিচুড়ি মুখে দিয়েই থু,থু, করে ফেলে দিলো দু'জনেই। 
আফসোস হলো,হায়! এখন কী করে ফেলে দেওয়া যাবে শখের এই ভুনাখিচুড়িগুলো। 
এত আফসোসের মাঝেও শেষ সমাধানটা আবিষ্কার করলো ম্যাডাম-কবি স্বয়ং।
- শোনো,দারোয়ানকে ডেকে সবগুলো খিচুড়ি যদি খেতে দেই তাকে,নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে সে,আর প্রসংশাও করবে আমাদের।
স্ত্রীর কথার প্রতিউত্তর না করে,দারোয়ানকে ডাকতে গেলেন ক্ষুধাতুর স্বামী।
গামলাভর্তি খিচুড়ি দেখে দু'চোখ চড়কগাছ দারোয়ানের! দশ বছরের চাকুরী জীবনে কখনোই এত পরিমানে খাবার খেতে দেয়নি কেউই তাকে, এড়া-ছাড়া-এঁটো-বাসি যদিও  কিছু পেয়েছে তবে এতবেশি পরিমানে পায়নি কখনোই। যাহোক কবি-ম্যাডামের বারান্দায় বসে গোগ্রাসে গিলতে লাগলো সে গামলাভর্তি ভুনাখিচুড়ি। ক্ষুধার চোটে উপর্যুপরি কয়েক গ্রাস খিচুড়ি খাওয়ার পরেই আকস্মিকভাবে রহস্যটা উদঘাটন করে ফেললো সে। 
এমনভাবে পুড়েছে খিচুড়িগুলো যে,আর একটু বেশি মাত্রায় পুড়ে গেলে কিন্তু তার বাবা-দাদারও সাধ্য হতো না একগ্রাস মুখে তোলার।
দারোয়ানের গাপুস-গুপুস খাওয়া দেখে, পরম কৌতুক নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ম্যাডাম,
-রান্নাটা ক্যামন হয়েছে ফকরু মিঞা?
দু'চার'বার প্রশ্ন করার পরেও উত্তর না পেয়ে,এবার একটু জোর দিয়েই জিজ্ঞেস করলেন,
-কিচ্ছু কেন বলছো না ফকরু মিঞা! ক্যামন হয়েছে রান্নাটা?
 বেশিরভাগ খিচুড়ি সাবার করার পরে ঢক ঢক করে কয়েক গ্লাস জল পান করে, সশব্দে দুটো ঢেকুর তুলে স্মিতহাস্যে উত্তর দিলো দারোয়ান,
-রান্নাটা ঠিক আমার মতোই হয়েছে ম্যাডাম।
-মানে। বুঝলাম না তো কিচ্ছু!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাহেবও মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝলো না ফকরু মিঞার কথার, অবাক হয়ে এবার প্রশ্ন করলেন তিনি,
-এসব কী বলছো ফকরু মিঞা? আমিও তো বুঝলাম না কিছু!
কবি-ম্যাডাম বললেন,
-আবার বলো তো শুনি,ক্যামন হয়েছে খিচুড়ির রান্না?
ফকরু মিঞার একই উত্তর,
-বললাম তো ঠিক আমার মতো'ই হয়েছে ম্যাডাম,রান্নাটা।
কিছুটা উত্তেজিত কণ্ঠে সাহেব বললেন এবার,
-আরে বাবা! খুলে বলো তো দেখি,কী বলতে চাও!
নিরুত্তেজে বলে চললো দারোয়ান,
-আমার মতোই হয়েছে,মানেটা বুঝলেন না স্যার! খিচুড়ির রান্নাটা  আরেকটু  ভালো হলে কিন্তু আমি তা পেতাম না, এবং আরও বেশি খারাপ হলে আমিও তা খেতাম না। কাজেই যা হয়েছে,ঠিক আমার মতোই হয়েছে,,,(সমাপ্ত) ২৬ শে এপ্রিল-২০২১ সোমবার,সন্ধ্যা।★

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.